সাধারণত পণ্য ও সেবার প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য সত্য-মিথ্যা যা কিছু প্রচার করা হয়—তার নাম বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপন একটি জনপ্রিয় একমুখী যোগাযোগ ব্যবস্থা। তবে সমাজ যেভাবে যাবতীয় শিল্পকলার দিকে সতর্ক সম্ভ্রমের দৃষ্টি রাখে, বিজ্ঞাপনের কপালে সে অর্থে সামগ্রিকভাবে সে নজর জোটেনি। সমাজ যেহেতু অর্থ-অনর্থের মূল মতবাদে আস্থা রাখেন, আর বিজ্ঞাপনের কাজ অর্থ উত্পাদন করা; ফলে বিজ্ঞাপনের প্রতি সচেতনদের এক তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিভঙ্গি জারি আছে।

 

সম্ভবত, বিজ্ঞাপনের স্বঘোষিত মিথ্যাচার এই শিল্পের মর্যাদায় নৈতিক বাধা হিসেবে কাজ করে। ‘প্রমোশন লাই’ হিসেবে বিজ্ঞাপন জগতে এক সর্বজনস্বীকৃত নীতি জাহির আছে। বিজ্ঞাপনমাত্রই মিথ্যা বলে ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে পণ্যের জয়গান করে, ফলে এর শিল্পরূপ নিয়ে কেউ তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে রাজি হয় না। ফলে, বিজ্ঞাপনের সামাজিক ক্ষতিবৃদ্ধি নিয়ে সাধারণের আগ্রহ তেমন নেই বললেই চলে।

 

অথচ বিজ্ঞাপনের অপূর্ব শিল্পরূপ তুলে ধরে জগতের অনেক বোদ্ধাই পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা খরচ করেছেন। এমনকি উপমহাদেশের গুণীজনরা বিজ্ঞাপনশিল্পে তাঁদের মেধা-মনন ব্যয় করেছেন। সত্যজিত্ রায় বিজ্ঞাপনী সংস্থায় কাজ করতেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেও অনেক বিজ্ঞাপন লিখেছেন। সে সময়কার ঝরণা কলমের কালির বিজ্ঞাপন তিনি লিখে দিয়েছিলেন, এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো। এ অঞ্চলের বিজ্ঞাপনের কথা তুলতে গেলে প্রথমেই আসে ব্রিটিশ আমলের কথা। সেই সময় কিছু বিজ্ঞাপন ছিল সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অভিনব ও নতুন। তার মধ্যে অন্যতম ছিলো চা ও কুইনাইনের বিজ্ঞাপন। ব্রিটিশ আমলে চাকে জনপ্রিয় করে তুলতে রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট, স্টিমারঘাটসহ পাবলিক প্লেসে বিজ্ঞাপন-ফলক লিখে প্রচার শুরু করে তারা। তাতেও সফল না হয়ে, বাঙালির প্রিয় পানীয় দুধের সঙ্গে মিশিয়ে চায়ের প্রচারণা চালানো হয়। তখনই ধরা দেয় সাফল্য। সেই বিজ্ঞাপনের সামাজিক প্রভাব এতদূর ছড়ায় যে, ভারতবর্ষের লোকেরা আজ পর্যন্ত দুধ মিশিয়ে চা খেতে ভালোবাসেন। ভারতবর্ষ বাদে বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় দুধ-চায়ের প্রচলন নেই বললেই চলে। সেই সব চায়ের বিজ্ঞাপনে চায়ের গুণাগুণ লেখা থাকত। এমনই একটি বিজ্ঞাপন এখনো আছে শ্রীমঙ্গল চা জাদুঘরে ও আদমজি জুট মিলের দেয়ালে। বিজ্ঞাপন জগতে একটি মিথ চালু আছে যে, পুরুষরা সবাই-ই আগে দাড়ি রাখত, পরে শেভিং ব্লেডের বিজ্ঞাপনে প্রভাবিত হয়েই লোকেরা একযোগে শ্মশ্রুহীন মুখাবয়ব নিয়ে ঘুরতে থাকে।

 

কিন্তু মোটা দাগে, জগতের সকল কর্মেরই বিজ্ঞাপনরূপ খুঁজে বের করা যেতে পারে। যেমন, অনেকে মনে করেন হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস হলো একগামিতার বিজ্ঞাপন, কিংবা তারেক মাসুদের চলচ্চিত্র এক একটি দেশাত্মবোধের বিজ্ঞাপন। ফলে, বিজ্ঞাপনের বিচিত্র ইন্টারপ্রিটেশন ও শিল্পরূপ এবং সামাজিক প্রভাব হাজির করা সম্ভব। ১৯৭৫ সালে লরা মালভি ‘ভিজুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ শিরোনামে চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধের সারমর্ম হলো—ভিজুয়াল আর্টের একটি গুরুতর কর্তব্য হলো দর্শকের জন্য ‘ভিজুয়াল প্লেজার’-এর বন্দোবস্ত করা। সে অর্থে পোস্টার, পত্রিকায় ছাপা বিজ্ঞাপন, বিলবোর্ড কিংবা পর্দার জন্য নির্মিত যেকোনো প্রোডাকশনকেই একটা ভিজুয়াল আর্ট হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রবন্ধে মালভি তাঁর প্রবন্ধে দু’রকম প্লেজারের ইঙ্গিত দিয়েছেন। একটি হলো ভিজুয়াল চরিত্র দর্শকের আদিম ইন্সটিংকট ক্রিয়া করে। আর অন্যটি হলো—দর্শক চরিত্রের সাথে নিজেকে একাকার করে নিজেকে সেই চরিত্ররূপে কল্পনায় গা ভাসিয়ে দেয়। ফুকোডীয় তত্ত্বে একে বলা হয় ‘সাবজেক্ট পজিশন’। অর্থাত্, এর নারী দর্শকরাও পুরুষের চোখেই বিজ্ঞাপিত নারীকে বিবেচনা করেন। আজকের পশ্চিমা বিশ্বে কলা অর্থে কিংবা পণ্য, সকল ধরনের শিল্পেই এই আদিম অবজেক্টের ছড়াছড়ি। এটা বোঝার জন্য পশ্চিমা বিশ্বের জনসংখ্যার দিকে একটু নজর দেয়া হলে দেখা যাবে, এই দেশগুলো খুব দ্রুতই এক ভয়াবহ সংকটের দিকে যাচ্ছে। ইউরোপের তুলনামূলক সচ্ছল সব দেশেই দিনে দিনে জনসংখ্যার হার হ্রাস পাচ্ছে। এ সংকট লক্ষ্য করে সে সকল দেশের রাষ্ট্রনীতিতেও আসছে নানান পরিবর্তন। কোনো কোনো দেশে সন্তান জন্মের পর ভরণপোষণের দায়দায়িত্ব সব সরকারই বহন করছে। এমনকি, ভয়ঙ্কর অপরাধীদেরও বিচারের রায়ে তারা মৃত্যুদণ্ড থেকে সরে এসেছে। কিন্তু, আমাদের দেশের পরিস্থিতি সে অবস্থা থেকে যথার্থই ভিন্ন।

 

পশ্চিমের অনুকরণে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে ভারত, যেহেতু তারা ইউরোপে ভিজুয়াল আইটেমের বিশাল এক বাজার সৃষ্টি করেছে। সমপ্রতি, এই দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজারও এক অপ্রয়োজনীয় অনুকরণে মনোযোগী হয়েছে। ফলে, দেখা যাচ্ছে, শুধু প্রসাধনী নয় এমনকি স্যানিটারি সামগ্রী কিংবা খাদ্যদ্রব্যের বিজ্ঞাপনেও অহেতুক এক ফ্রয়েডীয় ভিজুয়াল অহরহ উপস্থাপন করা হচ্ছে, যার সঙ্গে বিজ্ঞাপনি পণ্যের তেমন কোনো যোগাযোগই নেই।

 

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট এতটাই ভিন্ন যে, সমপ্রতি নিম্নমধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ খাত সৃষ্টি করেছে মানবসম্পদ রপ্তানি। ফলে, যৌন উত্তেজক প্রমোশন আমাদের সংস্কৃতিতে তেমন কোনো কাঙ্ক্ষিত বিষয় নয়। অনেকেই মনে করেন, নিম্নরুচি, সস্তামেধা ও স্বল্পবাজেটের কারণে প্লেজারের বিপরীতে এই দেশের বিজ্ঞাপন দিনে দিনে এক অস্বস্তিকর ভালগারিজমের চর্চায় পরিণত হচ্ছে। আমাদের দেশের মেধাবী নির্মাতারা বরং এই শিল্পের বিবিধ দৃষ্টিকোণ নিয়ে কাজ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাঁরা বেশ নান্দনিকভাবেই এই শিল্পের ভিন্নমাত্রায় বিকাশ ঘটাতে পারেন।