ডিসেম্বরে স্কুল থাকত না, আমারে তখন পাঠায়া দেওয়া হইত নানাবাড়ি মুন্সীগঞ্জে। মুন্সীগঞ্জ মফস্বল, কিন্তু একানব্বই-বিরানব্বইয়ের মুন্সীগঞ্জ শহর গণ্ডগ্রামের চেয়ে বেশি কিছু ছিল না। সেইখানে পুরান কোটগাঁও বইলা একটা মহল্লায় ছিল আমার নানাবাড়ি। অনেক পুরোনো শহর বইলা পুরান পুরান কিছু ঘরবাড়ি আর ইদ্রাকপুর কেল্লা ছাড়া চারপাশে সবই ক্ষেতখামার। বসতির আশেপাশে কিছু বাঁধানো পুকুর আর দুই-একটা পাকা রাস্তা। শীতের সকালের খেজুর রস আর মাইনষের ক্ষেতখামার থেকা মুলা-গাজর তুইলা জামা দিয়া মুইছা কাঁচা খাইয়া ফেলা আমি ওইখানেই শিখছি।

সেইখানে আমার একটা সমবয়সী ফ্রেন্ডসার্কেল হইছিল। কী রহস্যময় কারণে জানি তাদের খেলাধুলায় তেমন আগ্রহ ছিল না, সারা দিন খালি বনে-বাদারে ঘুরত। আমি তাদের লগে প্রায় দিনই গাছে উঠতে গিয়া নাইলে উস্টা পিছলা খাইয়া হাত-পা ছিলা বাসায় ফিরতাম। সন্ধ্যায় উঠানে খালারা বালতি নিয়া হাত-পা ধোয়ায় দিত আর সমানে বকত। বকাবকির মাঝখানে আমার ফ্রেন্ডসার্কেলের কার কার লগে মেলামেশা ঠিক না, সেইসব বিষয়েও উপদেশ দিত। ফলে আমি সেইগুলার লগেই অত্যধিক ঘোরাঘুরি করতাম।

আমার শৈশবের বেশির ভাগ সময় কাটছে বোঝা বহন কইরা। কিন্ডারগার্টেনের একগাদা বইখাতায় মুখ গুঁইজা সকাল-বিকেল স্কুল আর টিউশন আর হোমওয়ার্কে দিন কাটায়া দিতে হইত। এর মধ্যে আনন্দে থাকতাম বছরে শুধুমাত্র একটা মাস, ডিসেম্বর।

সেই কোটগাঁও মহল্লায়, অন্যান্য মহল্লার মতই দুই-তিনটা পাগল ছিল। তাদের একটার নাম ছিল জীবন পাগলা। অজাতশ্মশ্রু লোক, ঝিমকালা। সে জীবনেও নখ কাটত না। সেই নখের ভেতরে গোলাপ ফুলের পাপড়ি জমায়া রাখত। তার খাদ্যতালিকার প্রধান খাবার ছিল ফুল। রাত হইলে মাইনষের বাড়ির দরজার সামনে গিয়া ঘুমাইত। কেউ বাসার ভেতরে তারে ডাকলে সে ভেংচি দিয়া ভয় দিত। আমরা দিনের কিছুটা সময় তার পিছে পিছে ঘুইরা বেড়াইতাম।

আরও পড়েন

আরেকজন ছিল দাড়িওয়ালা, তার নাম খাইয়া ফেলছি। সে চান্স পাইলেই দোকান থেকা ডিম চুরি কইরা নিয়া গার্লস স্কুলের সামনে গিয়া খাড়ায়া থাকত। প্রায় দিনই দেখা যাইত, দুই-একটা মেয়েরে সে ডিম নিয়া দৌড়ানি দিতেছে। ভিকটিম মেয়েটা প্রাণপণে বইখাতা ফেলায়া ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়াইতে দৌড়াইতে একবারে বাসায় গিয়া থামত। সপ্তাহে অন্তত একদিন দেখা যাইত যে শরীর স্বাস্থ্যে দুর্বল এমন দুই-একটা মেয়ে কানতে কানতে বাসায় যাইতেছে, তার মাথা থেকা ভাঙা ডিম গড়ায়া গড়ায়া পড়তেছে।

এই নিয়া অবশ্য মহল্লাবাসীরে তেমন চিন্তিত হইতে দেখা যায় নাই কখনো। একবার ডিসি সাহেবের মেয়ের এই দশা হইল। তাতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো উদ্যোগ নিতে দেখা যায় নাই। বরং খাওনের টাইমে এই পাগলগুলা যেই বাড়ির সামনে ঘুরঘুর করতে থাকে, সেই বাড়ি থেকে একথালা ভাত তারে পাঠানো হইত। সকালের দিকে বাজারের হোটেলগুলার প্রধান টার্গেট থাকত তাদের তৈরি দিনের প্রথম খাবারটা যেকোনো একটা পাগলরে ধইরা খাওয়াইয়া দিতে। তার মধ্যে দিয়া তারা ব্যবসায়িক উন্নতির এক অলৌকিক সম্ভাবনা খুঁইজা পাইত।

আরেক পাগল ছিল বেনামি, লোকে তারে উকিল সাব বইলা ডাকত। যদিও তার মধ্যে কোনো প্রত্যক্ষ পাগলামির লক্ষণই ছিল না, তবুও লোকে তারে পাগল হিসেবেই চিনত। অন্তত আগের দুই পাগলের লগে তার কোনো মিলই নাই। সেই লোক মোটামুটি সচ্ছল। শীত-গ্রীষ্ম সারা বছর একটা কালো ওভারকোট আর লুঙ্গি পরত। সে থাকত একটা বিশাল বিশাল খাম্বাওয়ালা পুরোনো আমলের ছোট ইট দিয়া বানানো এক বাড়িতে। মাঝেমধ্যে দেখা যাইত, সে এক বস্তা কাচের বোতল কিনা নিয়া সন্ধ্যার দিকে বাড়িতে ফিরতেছে। কোনো একদিন তার হাতে থাকত বস্তা বস্তা ছাপানো কাগজ। লোকেরা বলে, সে উচ্চশিক্ষিত ছিল। বেশি পড়াশোনা করতে করতে ব্রেইনে আর খেলে নাই, পাগল হইয়া গেছেগা।

এই ছাপা কাগজ কাচের বোতলে লেবেল হিসেবে ব্যবহার করা হইত। সোডিয়াম কালারের সেই বোতলের মুখ ছিল লাল, লেবেলে লেখা থাকত কাজলের দাঁতের মাজন। লেবেলের সেই কাজলের পরিচয় সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। সে সকাল ৯টার দিকে বাজারে গিয়া ছোটটা দুই টাকা বড়টা পাঁচ টাকা দরে এই মাজন বিক্রি করত। শেষে বাড়ি ফেরার সময় হাতের বাজারের ব্যাগসহ জাস্ট পুস্কুনিতে একটা ডুব দিয়া তার পরে বাড়ি ফিরত।

সারা শরীর ভিজা, ওভারকোট পরা এক লোক যার বাজারের ব্যাগের পুইশাক-পাতাকপি উপচায়া পানি পড়তেছে, আর সে নির্বিকারভাবে হাঁটতেছে তো হাঁটতেছে; এমন দৃশ্য এখনো আমার চোখে ভাসে।

এই রকম নির্বিরোধি পাগলরে নিয়া চিন্তার কিছু নাই। পাড়ার লোকেরা বলত, তার শূচিবাই আছে। এমনকি, তার বাড়ির জানালা দিয়া আমরা চুকি মাইরা দেখছি, দিনভর সে জেট পাউডার নামক গুঁড়া সাবান পানি দিয়া গুলায়া তার মধ্যে দুই টাকা পাঁচ টাকাগুলা ধুইতে থাকত। পরে সেইগুলা উঠানে কাপড় শুকানোর তারে জেমসক্লিপ লাগায়া শুকাইতে দিত। দুই-একটা ত্যানাত্যানা নোট একবারেই ছিঁড়া গেলে সেইগুলা সে ফেলায়া দিত। আমরা প্রায়ই সেইগুলা টোকায়া আইনা কসটেপ মাইরা মিমি চকলেট কিনতাম।

আমরা জানতাম যে, তার নাকি টাকা-পয়সার কোনো অভাব নাই। পুরান সেই আখাম্বা বাড়িটাসহ সয়সম্পত্তি প্রচুর তার। যুদ্ধের সময় আক্ষরিক অর্থেই বস্তার মধ্যে আঁটে না এমন পরিমাণ টাকা নিয়া তার ফ্যামিলি যখন ভাইগা যাইতে নিছিল, সে তখন ব্যারিস্টারি পড়তে গেছে লন্ডনে। বাড়িতে ফিরত আইসা দেখে, বস্তা ভরা টাকা রক্তে মাখামাখি হইয়া পইড়া আছে।

লোকে বলে, বিলাতে গিয়া বেশি পড়াশোনা করতে গিয়া তার মাথা আউট হইয়া গেছে। ব্রেইনে কুলায় নাই, তাই পাগল হইয়া গেছেগা।