চিলড্রেন অব ওয়ার: দ্য গ্ল্যামার অব রেইপ

১।

ইন্ডিয়ার বাংলা পত্রিকা আনন্দবাজারে সম্প্রতি ঋদ্ধি সেনের একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হইছে। সাক্ষাৎকারের মূল ফোকাস ছিল এডাল্ট রেটিং চলচ্চিত্রগুলাতে নন-এডাল্ট ঋদ্ধি সেন কী উপায়ে কাজ কর্ম কইরা থাকেন।

পত্রিকাটার ভাষ্য, কৌশিক সেন-পুত্র ঋদ্ধি সেন, যার বয়স মাত্র ষোল, অলরেডি তিন তিনটা এডাল্ট বিষয় নিয়া ছবি কইরা ফেলছেন। তার ভিতরে একটা ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে তৈরি করা ছবি ‘চিলড্রেন অব ওয়ার’। এই ছবির বক্তব্য হইলো চার লক্ষেরও বেশি মেয়ে ধর্ষিত হয়েছিলেন তখন। জন্ম হয়েছিল হাজার হাজার ‘চিলড্রেন অব ওয়ারের।

ইংরেজিতে ‘চিল্ড্রেন অব ওয়ার : নাইন মান্থস টু ফ্রিডম’। আর আলোচিত এই কারণে যে, ভারতের চলচ্চিত্র ইতিহাসে এই প্রথম তারা অন্য দেশের ইতিহাসনির্ভর সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র নির্মাণ করলো। বাংলাদেশের জন্যও ঘটনাটি প্রথম ঘটলো। এর আগে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অন্য কোনো দেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হয় নাই।

তবে, ছবিটা দেখতে গিয়া দর্শকেরা মোটেও কোনো যুদ্ধশিশু বা চিলড্রেন অব ওয়ার খুঁইজা পাবেন না। তবে, ছবিশেষে হল থেকা বের হইলে চমক হিসেবে দর্শক আবিষ্কার করবেন, তো, ২০১৪ সালের মাঝামাঝিতে আইসা নির্মাতা মৃত্যুঞ্জয় দেওরত জন্ম দিলেন আরও একখানা চিলড্রেন অব ওয়ার, যার নাম উনি প্রথমে রাখতে চাইছিলেন দ্য বাস্টার্ড চাইল্ড।

আর উপলব্ধি করতে পারবেন, আগের নামটাই মনে হয় ভালো ছিল।

২।
সিনেমার অফিসিয়াল ওয়েবসাইট কিংবা স্টোরিলাইন পড়লে বোঝা যায় চিলড্রেন অব ওয়ার চলচ্চিত্রে পরিচালক যুদ্ধকালীন পাক বাহিনীর ধর্ষণের ডকুমেন্টেশন করতে চাইতেছিলেন। ফলে, দেখা যায়, পাক আর্মি অফিসারের প্রধান কর্ম ধর্ষণ করতে থাকা। হাসবেন্ডের সামনে ওয়াইফরে ধর্ষণ, তাঁবুর ভিতরে দিনরাত একের পর এক বন্দী নারীদের ধর্ষণ কিংবা মাঠের মধ্যে বন্দীদের চারদিকে দাঁড় করাইয়া মাঝখানে নারী মুক্তিযোদ্ধারে বাইন্ধা ধর্ষণ করা ছাড়া তার বিশেষ কোনো কাজকর্ম নাই। এর বাইরে, চল্লিশোর্ধ নারীদের আলাদা লাইনে নিয়া খুন কইরা ফেলাও তার আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসের পুরাটাই পৌনে তিন ঘণ্টার ভিতরে সেলুলয়েডের ফিতাবন্ধি করার চ্যালেঞ্জ নিছিলেন নির্মাতা মৃত্যুঞ্জয় দেওরত। ফলে, সিনেমায় দেখা যায় রাজাকার, যারা মুক্তিযোদ্ধার হাতেও মরে, পাক অফিসারের হাতেও মাইর-ধোর খাইতে থাকে। এক পর্যায়ে, পাড়ার গুণ্ডারা কলকাতার বাংলা ছবির নায়িকাদের যেই উপায়ে অপহরণ কইরা থাকে, তার চেয়েও সহজে মুক্তিযোদ্ধারা সেই পাক অফিসাররে অপহরণ কইরা ফেলতে সমর্থ হয়। ছবির শেষের দিকে দেখা যায় কতিপয় মুক্তিযোদ্ধা সদ্য ভাঁজভাঙা ধবধবে পাঞ্জাবি গায়ে দিয়া গলায় রুমাল ঝুলায়া আর্মি ক্যাম্প দখল কইরা নেয়।

এই ছবিতে একটা স্টোরি টেলিং আছে, কিন্তু সেই স্টোরির আগামাথা বুঝতে হইলে আগে থেকেই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে হাফেজ হইতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল অডিয়েন্সের জন্য এই স্টোরি কমিউনিকেট করা অসম্ভব। তার মানে এই না যে, লোকাল অডিয়েন্সের জন্য এই চলচ্চিত্র খুব কমিউনিকেটিভ। সিকোয়েন্স মেকিং এতটাই দুর্বল আর হাস্যকর যে, খোলা ময়দানে পিচ্চি পোলাপাইন পাক আর্মির কোমরের বন্দুক টাইনা নিয়া তারেই গুলি কইরা মাইরা ফেলে, আশেপাশের সৈন্যেরা কেউই সেইসব টের পায় না।

পুরা ছবিতে একটাও ক্যারেকটার, মনস্তাত্বিক ভাবে দূরের কথা, ভিজ্যুয়ালিও স্ট্যাবলিস্ট করতে পারেন নাই নির্মাতা মহাত্না মৃত্যুঞ্জয়। পুরা ছবিতে ডিটেইল বইলা কোনো কিছুর অস্তিত্ব নাই। তবে, দর্শকের পর্যাপ্ত দুঃখ উৎপাদন করার প্রয়াস দেখতে পাই দুই তিনটা স্লো টিউনের গানে। সিনেমার মধ্যে অন্তত, দুই একটা মন্তাজ কিংবা সিম্বোলিক শট ইত্যাদির ব্যবহার থাকলেও আঁতেলমার্কা ট্রাডিশনাল আর্টফিল্মের আওতায় ফেলা যাইতে পারতো এটারে।

এই ছবির একমাত্র এচিভমেন্ট, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়া দুর্বল ছবিগুলার একটা তালিকা করলে এইটারে এক নাম্বারে রাখা যাইতে পারে।

৩।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়া এ যাবৎ পর্যাপ্ত পরিমাণ চলচ্চিত্র উৎপাদন কইরা থুইছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র নির্মাতারা। এখনো সেই নির্মাণ প্রক্রিয়া চলতেছে। তো, এইসব চলচ্চিত্রের মধ্যেই কিছু কমন উপাদান হাজির আছে। তার মধ্যে অন্যতম উপাদানগুলা হইতেছে ধর্ষণ, বঙ্গবন্ধু, পাকবাহিনীর গণহত্যা, লুঙ্গিপরা মুক্তিযোদ্ধা, দাড়ি টুপিওয়ালা রাজাকার, নিরীহ সম্ভ্রান্ত বুইড়া মুসলমান, সন্তানপ্রসব, হিন্দু ফ্যামিলি, সহযোগী নারী মুক্তিযোদ্ধা যে কিনা ধরা খাইয়া যাবে, গোলাগুলিমূলক সম্মুখ যুদ্ধ, কিশোর বয়সী কারও এটাচমেন্ট, রেডিও, বাংলাদেশের পতাকা, নদী ও নৌকা, অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি। এই উপাদানগুলারে নিয়া ক্যামেরার ভিতর দিয়া যোগসূত্র উৎপাদন করতে পারলেই মোটামুটি বড় পর্দায় মুক্তিযুদ্ধ দেখা যাইতে পারে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ফর্মুলা ছবির পরিচালকেরাও এই বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ ও সিদ্ধহস্ত। সেইসাথে, দর্শক এবং ইন্টেলেকচুয়ালরাও এই ফর্মূলার বহুব্যবহারের গুণগান গাইতে অভ্যস্ত।

অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের যে সমস্ত বিষয়গুলারে মৌলিক উপাদান হিসেবে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে স্পষ্টভাবে হাজির নাই কিংবা ততটা হাইলাইট করা হয় নাই তা হইতেছে একাত্তরের পলিটিক্যাল নেতৃবৃন্দের মুভমেন্ট, বাংলাদেশে অবস্থানরত সশস্ত্র বাহিনীর বিপ্লব কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্প কিংবা ভারত উদ্বাস্তু শিবির, এই প্রত্যেকটা বিষয় নিয়া আলাদা আলাদা পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র সৃষ্টি করা সম্ভব।

ভারতে বইসা একজন পরিচালক যখন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো একটা সিরিয়াস আর সেনসিটিভ বিষয় নিয়া সিনেমা করতে নামছেন, তার কাছ থেকে বাংলাদেশি নির্মাতাদের থেকা ধার করা ফর্মুলার দুর্বল ডকুমেন্টেশনের বাইরে আরও কিছু না কিছু থাকার কথা। সেইটা কি?

বাংলাদেশের কোনো পরিচালক ভাবতেই পারেন না, একাত্তরের নারীদের ধর্ষণদৃশ্য, শুধুমাত্র ধর্ষণদৃশ্য একটা চলচ্চিত্রের প্রমোশনের প্রধান গ্ল্যামার সিম্বল হিসেবে হাজির হইতে পারে।

৪।
এইদফা সিনেমাটার প্রমোশনাল কার্যকলাপের দিকে লক্ষ্য করা যাক।
‘আমার অভিনয় জীবনে সব থেকে কঠিন দৃশ্য’— রাইমা সেন
“পাকিস্তানের সৈনিকরা কিভাবে ধর্ষণকে অত্যাচারের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতো তা বিশেষ জায়গা পেয়েছে চিলড্রেন অফ ওয়ার সিনেমাতে। আর সেই ধর্ষণের দৃশ্যে অভিনয় করতে গিয়েই বেশ বেগ পেতে হলো রাইমা সেন, তিলোত্তমা সোমের মতো অভিনেত্রীদেরও।”

সূত্র : নিউজনেক্সটবিডি ডটকম (৯ মে, ২০১৪)

“রিয়েলিটি নিয়ে ছবি করলে কেন তা টিনএজারদের দেখতে দেওয়া হবে না? আমাদের দেশের সেন্সর বোর্ডটা অদ্ভুত। ইন্টারনেটে তো টিনএজাররা পর্নফিল্ম দেখতে পারবে। কিন্তু তিলোত্তমা সোম অভিনীত ‘চিলড্রেন অব ওয়ার’-এর ধর্ষণের দৃশ্যটা দেখতে পারবে না!”— ঋদ্ধি সেন।

সূত্র : দৈনিক আনন্দবাজার (২৬ মে, ২০১৪)

ফলে, এই ছবির প্রমোশন যা বলে, ছবিতে রাইমা সেনের এক্সক্লুসিভ ধর্ষণ দৃশ্য আছে। না দেখলে মিস করবেন।

৫।
সম্প্রতি, স্পেশালি ইন্ডিয়ান ফিল্মগুলাতে, লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে পুঁজি কইরা প্রচুর অর্থলগ্নি করার আয়োজন শুরু হইছে। ইন্ডিয়ার অর্থনীতির একটা বিরাট যোগান দিতে থাকে তাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি, ফলে, কালচারাল ভিন্ন দেশের সেনসিটিভ উপাদান নিয়া নিজের দেশে চলচ্চিত্র উৎপাদন কইরা একই সাথে দেশি-বিদেশি দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ এবং অর্থ উপার্জন করার বুদ্ধি বাইর করছেন তারা। এইসকল সিনেমার মধ্যে দেখা যাবে, মুক্তিযুদ্ধের কোনো ইন্টেলেকচুয়াল ইন্টারপ্রিটেশন হাজির নাই। শুধুমাত্র ঢেউয়ের উপরিতলে ভাইসা থাকা ফেনামণ্ডলির মতো একঘেয়ে ডকুমেন্টেশন। এমনকি, খামাখাই অপ্রাসঙ্গিকভাবে কলকাতার ছবিগুলাতে বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধের গল্প নিয়া হাজির হইতে দেখা যাইতেছে। যথা, অপর্ণা সেন পরিচালিত গয়নার বাক্স। কিংবা গুন্ডে, কিংবা চিটাগাং— এগুলা বাংলাদেশি অডিয়েন্স মাথায় রাইখা বানানো মুভি। শেষ বিচারে, সেই উদ্যোগ আসলে ভারতীয় চলচ্চিত্রের বাংলাদেশে প্রদর্শনের ভিসা সংগ্রহের বিজ্ঞাপনমাত্র, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই।